বায়ুচাপ (Air Pressure) কাকে বলে?
⬛️ বায়ুচাপ (Air Pressure) কাকে বলে
👉 বায়ুর চাপ (Air Pressure) : পৃথিবীপৃষ্ঠের কোনো একক ক্ষেত্রফলযুক্ত স্থানে নির্দিষ্ট ওজনসমৃদ্ধ বায়ু যে পরিমাণ বল বা ওজন প্রয়োগ করে, তাকেই সেই স্থানের বায়ুর চাপ বলে ৷
উদাহরণ : সমুদ্রপৃষ্ঠে বা ভূপৃষ্ঠের কোনো 1 বর্গসেমি এলাকায় বায়ুর চাপ প্রায় 1 কিলোগ্রাম ওজনের সমান ।
⬛️ সমচাপরেখা কাকে বলে?
👉 সমচাপরেখা : বছরের কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে (জানুয়ারি ও জুলাই) পৃথিবীর যেসব স্থানে একই পরিমাণ বায়ুর চাপ থাকে, সেইসব স্থানগুলিকে মানচিত্রে যে কাল্পনিক রেখার দ্বারা যুক্ত করা হয়, তাকে সমচাপরেখা (Isobar) বা সমপ্রেষ রেখা বা বায়ুচাপরেখা বলে ।
■ সমচাপরেখার বৈশিষ্ট্য : 1️⃣ সমচাপরেখায় বায়ুচাপ গুলিকে মিলিবার (mb) এককে প্রকাশ করা হয়। পৃথিবীতে বায়ুচাপ সাধারণত 980 mb – 1050 mb। 2️⃣ সমচাপরেখায় সাধারণত বায়ুচাপের পরিমাণগুলি সমুদ্রপৃষ্ঠের বায়ুচাপের হিসেবে দেখানো হয়। 3️⃣ সাধারণত স্থলভাগের ওপর সমচাপ রেখাগুলি আঁকাবাঁকাভাবে বিস্তৃত হয় এবং জলভাগের ওপর প্রায় সমান্তরালে বিস্তৃত হয়। সমচাপ রেখাগুলি পরস্পরকে স্পর্শ বা অতিক্রম করে না। 4️⃣ সমচাপ রেখাগুলি যেখানে পরস্পরের খুব কাছে চলে আসে, সেই অঞ্চলে বায়ুচাপের পার্থক্য বেশি হয়। ঘনসন্নিবিষ্ট সমচাপরেখার অর্থ হল বায়ুপ্রবাহের গতিবেগের প্রাবল্য। 5️⃣ সমচাপ রেখাগুলি সাধারণত পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তারলাভ করেছে। 6️⃣ নিরক্ষরেখা থেকে ক্রমশ উত্তরে বা দক্ষিণে সমচাপ রেখাগুলির মান বাড়তে থাকে। 7️⃣ সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বায়ুচাপ উত্তর গোলার্ধের স্থলভাগের ওপর দেখা যায় ৷
⬛️ ডোলড্রাম / নিরক্ষীয় শাস্তবলয় (Doldrum / Equatorial Belt of Calm)
👉 সংজ্ঞা : শান্ত অবস্থা বিরাজ করার জন্য নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়কে নিরক্ষীয় শান্তবলয় বা ডোলড্রাম বলে।
■ অবস্থান: 5° উত্তর – 5° দক্ষিণ অক্ষরেখার মধ্যে নিরক্ষীয় শান্তবলয় অবস্থিত।
■ উৎপত্তি : নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্য সারাবছর লম্বভাবে কিরণ দেওয়ার ফলে এখানে উন্নতা খুব বেশি। তাই বায়ু সহজেই উম্ন ও হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায়। এ কারণে এখানে বায়ুর ঊর্ধ্বমুখী স্রোত দেখা যায় । ফলে ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে বায়ু প্রবাহিত হতে দেখা যায় না বা বায়ু চলাচল বোঝা যায় না। চারদিকে শান্ত অবস্থা বিরাজ করে । এজন্য এই অঞ্চলের নাম নিরক্ষীয় শান্তবলয় বা ডোলড্রাম ।
■ নামকরণ : ‘ডোলড্রাম’ নাবিকদের পারিভাষিক শব্দ। এর ইংরেজি অর্থ ‘ডিপ্রেস্ড’ অর্থাৎ অবদমিত। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে পালতোলা জাহাজ চালানোর সময় প্রায়ই জাহাজগুলি থেমে যেত। তাই নাবিকেরা এই অঞ্চলের নামকরণ করেন ডোলড্রাম।
⬛️ অশ্ব অক্ষাংশ (Horse Latitude)
👉সংজ্ঞা : কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয়কে অশ্ব অক্ষাংশ বা Horse Latitude বলা হয়।
■ অবস্থান : উভয় গোলার্ধে 25°–35° অক্ষাংশের মধ্যে অবস্থিত।
■ সৃষ্টি : কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় বরাবর শীতল ও ভারী বায়ু ওপর থেকে নীচে নেমে আসায় ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে কোনো বায়ুপ্রবাহ দেখা যায় না। ফলে এই দুটি বলয়ে শান্ত অবস্থা বিরাজ করে। এ কারণে ষোড়শ শতকে পালতোলা জাহাজগুলি এই শান্তবলয়ে এসে গতিহীন হয়ে পড়ত। ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ থেকে আসা ঘোড়া ভরতি জাহাজগুলির পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ ও আমেরিকায় যেতে অনেক বেশি সময় লাগত ৷ এই সময় পানীয় জল ও খাবারের সংকট কমাতে এবং জাহাজকে হালকা করার উদ্দেশ্যে নাবিকরা বেশ কিছু ঘোড়া (অশ্ব) সমুদ্রের জলে ফেলে দিত। এ কারণে এই দুই ক্রান্তীয় শান্তবলয় অশ্ব অক্ষাংশ নামে পরিচিত।
⬛️ ব্যারোমিটার (Barometer)
■ সংজ্ঞা : যে যন্ত্রের সাহায্যে বায়ুর চাপ মাপা হয়, তাকে ব্যারোমিটার বলে।
■আবিষ্কারক : 1643 সালে বিজ্ঞানী টরিসেলি ব্যারোমিটার যন্ত্রটি আবিষ্কার করেন।
■ যন্ত্রের প্রকৃতি : যন্ত্রটিতে একমুখবন্ধ ও পারদ ভরতি একটি কাচের নল, একটি পারদ ভরতি পাত্রে উপুড় করে ডোবানো থাকে। বায়ুর স্বাভাবিক চাপে কাচনলের মধ্যে 76 সেমি পারদ থাকে।
■ কার্যকারিতা : ভূপৃষ্ঠে বায়ুর চাপ বাড়লে পারদস্তম্ভের উচ্চতা বেড়ে যায় এবং বায়ুর চাপ কমলে পারদস্তম্ভের উচ্চতা নেমে যায় ।
⬛️ ঘূর্ণবাত (Cyclone),
■ সংজ্ঞা : কোনো অল্প পরিসর জায়গায় উন্নতা বৃদ্ধির কারণে হঠাৎ করে বায়ুর চাপ কমে গেলে শক্তিশালী নিম্নচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হয় এবং বাইরের দিকে উচ্চচাপ বিরাজ করে। এই অবস্থায় উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে এই নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে বায়ু প্রবল গতিতে ছুটে আসে, একে ঘূর্ণবাত বলে ৷
■ বৈশিষ্ট্য :
1️⃣ঘূর্ণবাতের কেন্দ্রে নিম্নচাপ ও বাইরে উচ্চচাপ বিরাজ করায় বায়ুপ্রবাহ কেন্দ্রমুখী হয়।
2️⃣ঘূর্ণবাতের বায়ুপ্রবাহ উত্তর-গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে (বামদিকে) এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে (ডানদিকে) চক্রাকারে কেন্দ্রে প্রবেশ করে।
3️⃣ঘূর্ণবাত দু-ধরনের হয়, ক্রান্তীয় ও নাতিশীতোষ্ব অঞ্চলের ঘূর্ণবাত। ও ঘূর্ণবাতের বিস্তার কম অঞ্চল জুড়ে হয়।
4️⃣ঘূর্ণবাতের গড় গতিবেগ প্রায় 160 500 কিমি/ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে।
5️⃣ঘূর্ণবাতের কেন্দ্রে শান্ত পরিবেশ থাকে।
6️⃣ঘূর্ণবাত স্বল্পস্থায়ী হয়।
7️⃣ঘূর্ণবাতের প্রভাবে প্রবল ঝড়-বৃষ্টি হওয়ায় জীবন ও সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
⬛️ প্রতীপ ঘূর্ণবাত (Anti Cyclone)
👉 সংজ্ঞা : কোনো জায়গায় উয়তা হ্রাসের কারণে বায়ুচাপ বেড়ে গেলে উচ্চচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হয় এবং বাইরের দিকে নিম্নচাপ বিরাজ করে। এই অবস্থায় বায়ু উচ্চচাপ কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে ছুটে যায়, একে প্রতীপ ঘূর্ণবাত বলে।
■ বৈশিষ্ট্য :
1️⃣প্রতীপ ঘূর্ণবাতে বায়ু উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়।
2️⃣এই বায়ু শীতল, বহির্মুখী ও নিম্নগামী হয়।
3️⃣এই বায়ুর গতিবেগ ঘূর্ণবাতের তুলনায় অনেকটা কম।
4️⃣সাধারণত উচ্চ অক্ষাংশে প্রতীপ ঘূর্ণবাত সৃষ্টি হয়।
5️⃣প্রতীপ ঘূর্ণবাতের অবস্থানে মেঘমুক্ত, শান্ত, রোদ ঝলমলে আবহাওয়া দেখা যায় ।
⬛️ ঘূর্ণবাতের চক্ষু
■ সংজ্ঞা : বিধ্বংসী ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাতের কেন্দ্রকে ‘ঘূর্ণবাতের চক্ষু’ (Eye of the Cyclone) বলে।
■ বৈশিষ্ট্য : (1) এই অঞ্চলে বায়ুর গতিবেগ খুব কম হয় । (2) এখানে আকাশ মেঘমুক্ত থাকে। ফলে ঘূর্ণবাতের চক্ষু যখন যেখানে অবস্থান করে তখন সেখানে বৃষ্টি হয় না। (3) এই অঞ্চলে উন্নতা খুব বেশি হয় এবং বায়ুর চাপ সবচেয়ে কম থাকে। (4) ঘূর্ণবাতের চক্ষুর ব্যাসার্ধ 20-60 কিমি পর্যন্ত হয় ।
⬛️ কোরিওলিস বল (Coriolis Force)
■ সূত্র : আবর্তন গতির কারণে পৃথিবীর যে-কোনো গতিশীল বস্তুর(বায়ুপ্রবাহ,সমুদ্রস্রোত) ওপর এক ধরনের বল কাজ করে,যা বস্তুগুলির দিকবিক্ষেপ ঘটায়। এই বলকে কোরিওলিস বল বলে।
■ নামকরণ : 1835 সালে ফরাসি গণিতবিদ গ্যাসপার ডি কোরিওলিস প্রথম এই বলের কথা বলেন তাই তাঁর নামানুসারে এই বলের নামকরণ করা হয় কোরিওলিস বল।
■ বৈশিষ্ট্য :
1️⃣গতিশীল বস্তু যেমন বায়ুপ্রবাহের সঙ্গে এই বল সমকোণে কাজ করে।
2️⃣বস্তুর গতি যত বেশি হয়, কোরিওলিস বলের কারণে তার বিক্ষেপও তত বেশি হয়।
3️⃣নিরক্ষরেখায় এই বলের মান শূন্য এবং উভয় মেরুর দিকে ক্রমশ এই বলের মান বাড়তে থাকে।
4️⃣বায়ুর গতিবেগ বৃদ্ধি পেলে এই বলের পরিমাণও বাড়তে থাকে।
5️⃣এই বায়ুর প্রভাবে বায়ুর দিকবিক্ষেপ ঘটলেও এই বলের পরিমাণ কোনো অঞ্চলের অক্ষাংশগত অবস্থানের ওপর নির্ভর করে।
■ প্রভাব : কোরিওলিস বলের প্রভাবে বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্রোত উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয় ।
⬛️ ফেরেলের সূত্র (Ferrel’s Law) ★★
■ সূত্র : পৃথিবীর আবর্তন গতির ফলে উদ্ভূত কোরিওলিস বলের প্রভাবে বায়ু উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপের দিকে সোজাপথে প্রবাহিত না হয়ে উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়, একেই বলা হয় ফেরেলের সূত্র।
■ নামকরণ : 1859 সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের আবহবিদ উইলিয়ম ফেরেল এই সূত্রটি আবিষ্কার করেন বলে তাঁর নামানুসারে এই সূত্রের নামকরণ হয়েছে ফেরেলের সূত্র।
■ উদাহরণ : ফেরেলের সূত্রানুসারে, আয়ন বায়ু উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে বেঁকে উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু ও দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ুরূপে প্রবাহিত হয় ৷
বায়ুচাপ (Air Pressure) কাকে বলে
Comments
Post a Comment