রাসায়নিক আবহবিকার কি

■ রাসায়নিক আবহবিকার

👉 রাসায়নিক আবহবিকার সংজ্ঞা : বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন গ্যাস, (অক্সিজেন, কার্বন ডাইঅক্সাইড, জলীয় বাষ্প প্রভৃতি) ভূপৃষ্ঠের র জল ও বিভিন্ন অম্লের উপস্থিতিতে ভূপৃষ্ঠের শিলাস্তর রাসায়নিকভাবে বিয়োজিত হলে, তাকে রাসায়নিক আবহবিকার বলে।


● রাসায়নিক আবাবিকারের প্রক্রিয়াসমূহ

👉 রাসায়নিক আবহবিকারের প্রধান প্রক্রিয়াগুলি নীচে আলোচনা করা হল-


1. কার্বোনেশন বা অঙ্গারযোজন : বায়ুমণ্ডলের কার্বনডাইঅক্সাইডের (CO2) সঙ্গে জলের রাসায়নিক সংযোগে সৃষ্ট কার্বনিক অ্যাসিড (H2CO3) শিলা খনিজের সাথে বিক্রিয়া ঘটিয়ে শিলার পরিবর্তন ঘটালে, তাকে কার্বোনেশন (Carbonation) বলে। বৃষ্টির জল বাতাসের কার্বন ডাইঅক্সাইডের সাথে মিশে সৃষ্টি হয় মৃদু কার্বনিক অ্যাসিড (H2O + CO2 = H2CO3)। এই কার্বনিক অ্যাসিড চুনাপাথর বা ক্যালশিয়াম কার্বনেটের সাথে বিক্রিয়া ঘটিয়ে ক্যালশিয়াম বাইকার্বনেট তৈরি করে, যা সহজেই দ্রবীভূত হয়। চুনাপাথর, ফেল্ডস্পার, হর্নব্লেজ প্রভৃতি খনিজের ওপরও এই প্রক্রিয়া কার্যকর হয় এবং চুন সমৃদ্ধ মাটির উৎপত্তি হয়। যেমন রেনজিনা, চারনোজে প্রভৃতি মাটি।


2. অক্সিডেশন বা জারণ: জল বা জলীয় বাষ্পের উপস্থিতিতে শিলামধ্যস্থ খনিজের সাথে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় অক্সিজেন যুক্ত হয়ে শিলার পরিবর্তন ঘটালে, তাকে জারণ (Oxidation) বলে। ভূপৃষ্ঠে যেসকল শিলার মধ্যে লোহা আছে সেখানেই এই প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল। তা ছাড়া অ্যাম্ফিবোল, পাইরক্সিন ও বায়োটাইট খনিজের ওপরেও অক্সিডেশন কার্যকর হয়। লোহা যখন ফেরাস অক্সাইড রূপে থাকে তখন তা অত্যন্ত কঠিন কিন্তু অক্সিডেশন প্রক্রিয়ায় যখন ফেরিক অক্সাইডে পরিণত হয়। (4FeO + O2 → 2Fe, O3) তখন তা সহজে ভেঙে যায়, ফলে শিলায় মরচে পড়ে। ফেরাস সালফাইড এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফেরাস সালফেটে পরিণত হয়। এভাবে লাল, হলুদ, বাদামি, ল্যাটেরাইট প্রভৃতি মাটি গঠিত হয়।


3. হাইড্রেশন বা জলযোজন : শিলা খনিজের সাথে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় জল যুক্ত হয়ে শিলার রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটালে তাকে হাইড্রেশন (Hydration) বলে। এই প্রক্রিয়ায় জলের অণুগুলি শিলামধ্যস্থিত খনিজের . অণুগুলির মধ্যে প্রবেশ করে খনিজের গ্রন্থিবন্ধনগুলিকে আলগা করে তোলে। খনিজগুলির মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন হ্রাস পাওয়ায় গৌণ খনিজগুলি নমনীয় হয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হেমাটাইট লিমোনাইট, অ্যানহাইড্রাইড জিপসামে এবং অলিভিন সার্পেন্টাইনে পরিণত হয় এবং পরবর্তীকালে লিমোনাইট ও জিপসাম সমৃদ্ধ মাটির সৃষ্টি হয়


4. হাইড্রোলিসিস বা আর্দ্র বিশ্লেষণ :  এটি রাসায়নিক আবহবিকারের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। জল হাইড্রোজেন (H+) এবং হাইড্রোক্সিল (OH−) আয়নে ভেঙে গিয়ে খনিজের সাথে বিক্রিয়া ঘটিয়ে রাসায়নিক আবহবিকার ঘটালে তাকে হাইড্রোলিসিস বা আর্দ্র বিশ্লেষণ বলে। ফেল্ডস্পার এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সিলিসিক অ্যাসিড পটাশিয়াম অ্যালুমিনো সিলিসিক হাইড্রোক্সাইডে পরিণত হয়। এভাবে ক্যালশিয়াম ও পটাশিয়াম থেকে ক্ষারধর্মী মাটির সৃষ্টি হয়।


■ কোন জলবায়ু অঞ্চলে রাসায়নিক আবহবিকার দেখা যায়?

Or, 

কোন জলবায়ু অঞ্চলে রাসায়নিক আবহবিকার প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়?

Or

রাসায়নিক আবহবিকার কোন জলবায়ু অঞ্চলে বেশি দেখা যায়?

👉 রাসায়নিক আবহবিকার প্রধানত নিরক্ষীয় উষ্ণ আর্দ্র এবং ক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চলে ব্যাপক ভাবে দেখা যায়।


■ যান্ত্রিক আবহবিকার ও রাসায়নিক আবহবিকার এর মধ্যে পার্থক্য

Or

যান্ত্রিক ও রাসায়নিক আবহবিকার এর পার্থক্য 

👉 যান্ত্রিক আবহবিকার (Mechanical Weathering)


রাসায়নিক আবহবিকার (Chemical Weathering)


(১) বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে শিলাস্তর যখন ফেটে ছোটো ছোটো খন্ড বা চূর্ণে পরিণত হয়ে মূল শিলার ওপরে অবস্থান করে তখন তাকে যান্ত্রিক আবহবিকার বলে ।


(১) নানান রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় শিলা বিয়োজিত হওয়ার ঘটনাকে রাসায়নিক আবহবিকার বলে ।


(২) যান্ত্রিক আবহবিকারে শিলার শুধুমাত্র বাহ্যিক (ভৌত) পরিবর্তন হয়, রাসায়নিক গঠনের কোনো পরিবর্তনন হয় না ।


(২) রাসায়নিক আবহবিকারে বাহ্যিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিলার মূল রাসায়নিক গঠনও পরিবর্তিত হয় ।


(৩) যান্ত্রিক আবহবিকার প্রধানত তাপমাত্রার পরিবর্তনে, শিলাস্তরের মধ্যে চাপ হ্রাসের ফলে, জল তুষারে পরিবর্তিত হওয়ার ফলে চাপ বৃদ্ধিতে এবং মানুষ ও জীবজন্তু বা কীটপতঙ্গের কাজকর্মের ফলে সংঘটিত হয় ।


(৩) রাসায়নিক আবহবিকার প্রধানত অঙ্গারযোজন, জারণ, জলযোজন এবং দ্রবণের ফলে সংঘটিত হয় ।


(৪) যান্ত্রিক আবহবিকার প্রধানত উষ্ণ মরু অঞ্চল, নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল এবং শীতপ্রধান অঞ্চলের শুকনো আবহাওয়াযুক্ত অংশেই বেশি মাত্রায় সংঘটিত হয় ।


(৪) অপরপক্ষে রাসায়নিক আবহবিকার প্রধানত উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুযুক্ত নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় অঞ্চলেই বেশি মাত্রায় সংঘটিত হয় ।


(৫) যান্ত্রিক আবহবিকার সংঘটিত হওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে শব্দ সৃষ্টি হয় ।


(৫) রাসায়নিক আবহবিকার সংঘটিত হওয়ার সময়ে কোনো শব্দ সৃষ্টি হয় না ।


(৬) যান্ত্রিক আবহবিকারের বিভিন্ন পর্যায় হল:- পিন্ড বিশরণ, শল্কমোচন, ক্ষুদ্রকণা বিশরণ, তুহিন খন্ডীকরণ প্রভৃতি ।               


(৬) রাসায়নিক আবহবিকারের বিভিন্ন পর্যায় হল:- অঙ্গারযোজন, জারণ, জলযোজন, দ্রবণ প্রভৃতি ।  


■ জৈব রাসায়নিক আবহবিকার কাকে বলে?


👉 জৈব রাসায়নিক আবহবিকারের সংজ্ঞা : আবহবিকার এর আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদান ছাড়াও শিলার জৈব রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটানোর জন্য জীবজগৎ অর্থাৎ উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদান এর উপস্থিতিতে প্রাণী ও উদ্ভিদের যে ভৌত ও রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে তাকে জৈব আবহবিকার বলা হয়।


■ রাসায়নিক আবহবিকার বলতে কী বোঝো?

Or

রাসায়নিক আবহবিকার কাকে বলে?


👉 রাসায়নিক আবহবিকারের সংজ্ঞা : যে আবহবিকারের মাধ্যমে শিলা গঠনকারী বিভিন্ন খনিজ পদার্থগুলির ওপর বায়ুমন্ডলের প্রধান উপাদান সমূহ বিশেষ করে অক্সিজেন (O2), কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO2), জ্বলীয় বাষ্প প্রভৃতির বিক্রিয়ার ফলে কঠিন শিলা বিয়োজিত হয় এবং মূল খনিজ পদার্থগুলি নতুন গৌণ খনিজে পরিণত হয়ে মূল শিলা শিথিল হয়ে পড়ে, তাকে রাসায়নিক আবহবিকার বলে ।


■ জৈব রাসায়নিক আবহবিকার কোন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত?


👉 জৈব রাসায়নিক আবহবিকার একটি প্রক্রিয়া যা প্রাকৃতিক বা প্রযুক্তিগত উৎস ব্যবহার করে বিভিন্ন পদার্থের রাসায়নিক পরিবর্তন সৃষ্টি করে। এই প্রক্রিয়া প্রায়শই জীবাণুগত পদার্থসমূহের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিছু উদাহরণ হলো-

১। জৈব উপস্থিতির সাথে পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রোটিন বা এনজাইমের গুণগত বৃদ্ধি।

২। একটি জীবনপ্রদায়ক পদার্থের সাথে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক উৎসের কাজে একটি নতুন পদার্থের তৈরি।


আরো পড়ুন : 

মৃত্তিকা কাকে বলে

বায়ুচাপ (Air Pressure) কাকে বলে

অন্তর্জাত প্রক্রিয়া কাকে বলে

রাসায়নিক আবহবিকার কি 

অ্যাকুইফার কি

ভৌমজল কী


Comments

Popular posts from this blog

ভঙ্গিল পর্বত কাকে বলে?

পাত কাকে বলে ?

কুমারী নদী নর্মদা এবং আত্রেয়ী